পরিবারকে কিভাবে ভালোবাসা যায় ( How to love your family )

পরিবার হল সমাজের আদি এবং অন্যতম প্রতিষ্ঠান । সমাজে বসবাসের সুবিধার্থে বিভিন্ন ধরনের পরিবারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় । আমাদের দেশে দুই ধরনের পরিবার ব্যবস্থাপনা বিদ্যমান । একটি হলো অনু পরিবার এবং অপরটি হল বড় পরিবার । অনু পরিবারে মূলত স্বামী স্ত্রী তার সন্তানদের নিয়ে বসবাস করে । অপরদিকে জয়েন ফ্যামিলি কিংবা বড় পরিবার বলতে এমনই পরিবারকে বোঝানো হয়েছে যেখানে স্বামী-স্ত্রী তাদের বাবা-মা ভাই-বোন দাদা দাদি এবং সন্তানাদি নিয়ে বড় পরিবারে বসবাস করে । যদিওবা বর্তমান যুগে জয়েন্ট ফামিলি লক্ষ করা যায় না । চতুর্দিকেই অনু পরিবার বিদ্যমান । যদিও বা কোন পরিবারে বসবাসের ফলে আপনি নানা ধরনের বিপদে পড়তে পারেন তারপরও এই অনু পরিবারের জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয় । একটি সন্তান জন্মদানের পর লালন-পালন বেড়ে ওঠা সবকিছুই পরিবারের মাধ্যমেই সুসংগঠিত হয়ে থাকে । একটি সন্তানের আচার-ব্যবহার কিরূপ হবে তা অনেকখানি তার পরিবারের উপরে নির্ভর করে । তাই সম্পর্কে ভাল রাখতে হলে অবশ্যই আপনার পরিবারকে উপযুক্ত ভাবে তৈরি করাটা অত্যন্ত জরুরী । বর্তমান যুগে পরিবারের উপর প্রেম বা ভালবাসার বিষয়টি অনেকখানি কমে গিয়েছে । মানুষের মাঝে পরিবারের প্রেম-ভালোবাসা এখন আর তেমনটা লক্ষ করা যায় না । এমনকি পরিবারের ছোট সদস্যরাও পরিবারকে কিভাবে ভালবাসবে তা তাদের জানা নেই । অথচ পরিবারের সদস্য হিসেবে আপনাকে অবশ্যই পরিবারকে ভালবাসতে হবে । না হলে আপনি যে পরিবারে বসবাস করছেন সে পরিবারের আপনি ঠিকঠাক বসবাস করতে পারবেন না । তাই পরিবারের সদস্য হিসেবে কিভাবে আপনি আপনার পরিবারকে ভালোবাসবেন আমাদের আজকের এই ব্লগপোস্ট থেকে সে বিষয় সম্পর্কে আমরা আপনাকে জানানোর চেষ্টা করব । চলুন তাহলে দেরি না করে শুরু করা যাক ।

 

পরিবারকে ভালোবাসার সহজ উপায়

 

✅নেতিবাচক মন্তব্য এড়িয়ে চলুন – একটি পরিবারে বসবাস করতে গেলে নানা ধরনের কথাবার্তা সঞ্চালিত হয়ে থাকে । পরিবারের সদস্য হিসেবে এইসব কথাবার্তা আপনি শুনতে খানিকটা বাধ্য । এর মধ্যে কিছু কথা আপনার ভালো লাগবে আবার এমন অনেক কথাই থাকবে যা আপনার মন খারাপ করে দেবে । কিন্তু যেসব কথা আপনার মন খারাপ করে দেবে সেই কথাগুলো নিয়ে পরবর্তীতে না বাড়াবাড়ি করাটাই শ্রেয় । যতটা পারবেন নেগেটিভ মন্তব্য এড়িয়ে চলো । একটা কথা মাথায় রাখবেন মানুষ পুরোপুরি রূপে কখনই উচিত নয় । ঠিক তেমনি ভাবে প্রত্যেকের কথা বলার মাঝে নেগেটিভ পজেটিভ উভয় দিক বিদ্যমান থাকবে এটাই স্বাভাবিক । ধরুন আপনার পরিবারের কোন সদস্য যদি আপনাকে খারাপ কোন কথা বলে তাহলে আপনার মন খারাপ হয়ে যাবে । আপনারা তো তখন ভাবতে শুরু করবেন সেই সদস্য টি আপনাকে আর ভালোবাসে না । কিন্তু আপনার এ ধারণাটি একেবারেই ভুল । একটু চিন্তা করে দেখুন তো সেই সদস্যটি আপনাকে কতবার খারাপ কথা শুনিয়েছে আর কতবার ইভা আপনাকে ভালো কথা শুনিয়েছে । এমন অনেক সময়ে উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যে আপনার পরিবারের সদস্য টি বাধ্য হয়েই আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন । যদিও বা তিনি মন থেকে চাননি আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে । তার খারাপ কথাগুলো ভুলে ভালো কথাগুলো মাথায় রেখে তার সাথে আপোষ করবেন অযথাই অশান্তি সৃষ্টি করবেন না , এতে করে পারিবারিক অশান্তি দেখা দেবে । আবার এমন অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় যে আপনার পাড়া-প্রতিবেশী আপনাকে পরিবার সম্পর্কে নানা ধরনের ভুল তথ্য দিয়ে আপনাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবেন । পরিবারের সদস্য হিসেবে কখনোই পাড়া-প্রতিবেশীর কথায় কান দিয়ে পরিবারের সাথে অশান্তি করবেন না । পরিবার হলো আপনার পরম বন্ধু সে বন্ধুর সংস্পর্শেই আজ আপনি এত সহজে বেড়ে উঠেছেন । তাই পরিবারকে ভালবাসতে হলে নেতিবাচক মন্তব্য এড়িয়ে ইতিবাচক চিন্তা করুন এবং পরিবারকে ভালোবাসুন ।

 

✅সরাসরি কথা বলুন – আমরা সচরাচর পরিবারের সাথে নানা ধরনের কথা বলে থাকি । এর মধ্যে এমন অনেক কথাই রয়েছে যা আমরা পরিবারের সাথে শেয়ার করতে পারিনা । আবার এমন অনেক সময় দেখা যায় যে আপনার পরিবার আপনাকে কিছু বলেছে তার বিপরীতে আপনি যে কিছু বলবেন সেরকম সাহস কিংবা সময় আপনার হয়ে ওঠে না । ধরুন আপনার পরিবারের কোনো সদস্য আপনাকে কিছু বলেছে । তার সে কথায় আপনি মন থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছেন । আর তাই হয়তো আপনি তার সাথে আর ঠিকঠাক কথা বলছেন না । মন খারাপ করে বসে আছেন । মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখেছেন যা আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর এমনকি এ বিষয়টি পারিবারিক সম্পর্কের জন্য হুমকিস্বরূপ । যা কিছুই সমস্যা হয়ে যাক না কেন আপনি সরাসরি আপনার মনের ভাব প্রকাশ করুন । এতে করে আপনার সমস্যা সমাধান না হলে পারিবারিক সম্পর্ক বিনষ্ট হবে না এবং আপনি মন থেকে শান্তি পাব না । আপনি তাদের নিজের কষ্টের কথা বোঝানোর চেষ্টা করুন । আপনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন পরিবারের অন্যান্য সদস্য গুলো অনেক কথাই আপনার খারাপ লাগে যা আপনার মন খারাপের কারণও ঘটে । এতে করে হয়তো অন্যান্য সদস্য গুলো আপনাকে কষ্ট দিয়ে আর কথা বলবে না তারা তাদের আচরণ সংযত করতে পারবেন । আর তাই যথাসম্ভব পরিবারের সাথে মন খুলে কথা বলার চেষ্টা করবেন যা আপনার পারিবারিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করে গড়ে তোলে ।

 

✅পরিবারকে সময় দিন – পরিবারকে ভালোবাসার পূর্ব শর্ত হলো পরিবারকে সময় । আপনি যদি আপনার পরিবারের সময় না দেন আপনি কখনো আপনার পরিবারকে ভালোবাসতে পারবেন না ‌ । আপনার তো বলতে পারেন আপনি কাজকর্মে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন আর তাই আপনি আপনার পরিবারকে সময় দিতে পারেন না । আপনার জন্যই বলছি আপনি যদি এভাবেই পরিবারের থেকে নিজেকে দূরে রাখেন তাহলে পরিবারের থেকে আপনি অনেকখানি দূরে চলে যাবে যা আপনার পারিবারিক সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করবে । আপনি যত ব্যস্ত হয়ে থাকেন না কেন যত কাজই করুন না কেন প্রত্যেক কর্মঠ ব্যক্তির সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা থাকবেই এটাই স্বাভাবিক । আছিস সপ্তাহিক ছুটি পুরোটা সময় জুড়ে পরিবারকে দেবার চেষ্টা করুন । সেই সাপ্তাহিক ছুটিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করবেন । যাতে করে আপনি আপনার পরিবারকে খুশি রাখতে পারেন । আপনি তো একটু লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন যে আপনার পরিবার যখন খুশিতে থাকবে আপনি নিজেও খুশি থাকবেন । এখন আপনি যদি মনে করেন সাপ্তাহিক ছুটিতেও আপনার পরিবারকে সময় দেয়ার মত আপনার সময় নেই । তাহলে অন্তত রাতে খাবারের টেবিলে বসে একসাথে রাতে খাবার খেতে পারেন । এতে করে সে টেবিলে বসে নানা ধরনের আলাপচারিতা আপনি চাইলে সেরে নিতে পারেন । এমনকি খাওয়া শেষে সবাই একসাথে বসে খানিকটা সময় টিভি দেখতে পারেন । আর এভাবেও আপনি আপনার পরিবারে কাছাকাছি যেতে পারবেন এবং ভালবাসতে পারবেন ।

 

✅পরিবারের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে রাখুন – আমরা পরিবারে ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত নানা ধরনের সময় কাটিয়েছি । আর সেই মুহূর্ত গুলোর মধ্যে এমন অনেক মুহূর্তে রয়েছে যা আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে । যা হয়তো আপনি চাইলে কখনো ভুলতে পারবেন না । এর মধ্যে কিছু মুহূর্ত রয়েছে যা আপনাকে আনন্দ দেয় আবার এমন অনেক মুহূর্ত রয়েছে যা আপনাকে কষ্ট দেয় । তবে খারাপ লাগার মুহূর্ত গুলো ভুলে যাওয়াই আপনার জন্য ভালো হবে । না হলে আপনার পরিবারের উপর খানিকটা অভক্তি চলে আসতে পারে । তাই সেই সব মুহূর্তগুলো মনে রাখুন যা ভাবলেই আপনাকে আনন্দে শিহরিত করে । হতে পারে সেই মুহূর্তটা আপনার বাবা মার সাথে কিংবা ভাই বোনের সাথে আবার আপনার সন্তানের সাথে হতে পারে । আপনি যখন পরিবার থেকে অনেক দূরে থাকবেন সেই মুহূর্তগুলো আপনাকে পুনরায় পরিবারকে ভালোবাসার অনুপ্রেরণা যোগাবে । আর এভাবেই আপনি আপনার পরিবারের উপর আপনার ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে পারবে । আর যদি খারাপ মুহূর্তের গুলোর কথা মনে আসে তাহলে আপনার পরিবারের উপর ভালোবাসা ধীরে ধীরে কমে যাবে । তাই শুধুমাত্র সেই সকল মুহূর্তগুলো মনে রাখুন যে আপনাকে আনন্দ দেয় । যথাসম্ভব আনন্দঘন মুহূর্ত গুলোর ছবি বাই স্টিল ফটো ধারণ করার চেষ্টা করবেন । যেন সেই মুহূর্তগুলো ছবির মাধ্যমে আজীবন বেঁচে থাকে । বর্তমান প্রযুক্তির বদৌলতে ছবি তোলাটা বিশেষ কোন কিছু নয় । আপনি চাইলেই আপনার মোবাইল থেকেই যখন তখন যেকোনো মুহূর্তের ছবি তুলে রাখতে পারেন ।

 

✅লিস্ট তৈরি করুন – আপনার হয়তো মনে হতে পারে লিস্ট তৈরি করার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক কি ? আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ছোট-বড় নানা ধরনের ঘটনা থাকে । আর পরিবার জীবনে এই ঘটনার কোনো কমতি নেই । আর আপনার পরিবার জীবনের সকল ঘটনা একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করুন । আবার সময় করে সেই খাতাটি যাচাই করুন । সেই খাতাটি যাচাই-বাছাই করে বোঝার চেষ্টা করলাম যে আপনার পরিবারিক জীবনে কতবার আপনি কষ্ট পেয়েছেন আর কতবার আপনি খুশি হয়েছিলেন । আপনি সেই লিস্ট থেকে যদি পাঁচবারের বেশি খারাপ মুহূর্তগুলো খুঁজে পান সেই মুহূর্তগুলো চিহ্নিত করবার চেষ্টা করুন । সেই মুহূর্তগুলো চিহ্নিত করবার পর পুনরায় সে গুলোকে যাচাই-বাছাই করুন এবং কেনই বা সেই মুহূর্তগুলো আপনার জীবনে খারাপ তা নির্ণয় করুন । আর পরবর্তীতে একই রকম ঘটনার সূত্রপাত যেন না ঘটে তা নিশ্চিত করুন । সেই সকল ঘটনা গুলোর মধ্যে যদি আপনার ন্যূনতম কোন ভুল থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই তা স্বীকার করে নিন । আর ক্ষমা চেয়ে নিন । তাহলেই দেখবেন আপনার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা অনেকাংশে বেড়ে গেছে ।

 

আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা । সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গেলে অবশ্যই আপনাকে মন থেকে আপনার পরিবারকে ভালবাসতে হবে । তা না হলে আপনি কখনোই আপনার পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে । পরিবারের কোনো সদস্য দের সাথে আপনার যদি ঝামেলায় থাকে তা যত দ্রুত পারেন মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন । কোন ঝামেলায় যেন বড় কোন ঝামেলায় রূপ না নেয় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখুন । আর পরিবারের সাথে ঝামেলা বা বিবাদ বিষয়টা একেবারেই খারাপ একটি বিষয় । আপনার পরিবারের সাথে যখন আপনার খারাপ সম্পর্ক তৈরি হবে তখন আপনার আশেপাশের মানুষগুলো সেই সম্পর্ককে আরও জ্বালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন । তাই সাবধানতা অবলম্বন করুন । পরিবারের থেকে কখনোই একটানা দূরে থাকবেন না । এ বিষয়টি পরিবারের সাথে আপনার সম্পর্ক বিনষ্ট করে দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার । চলুন আমরা আজ থেকেই আমাদের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করি আর পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষকে মন থেকে ভালোবাসি আশাকরি আপনার পারিবারিক জীবন সুখের এবং সুন্দর হোক । আমাদের আজকের এই ব্লগ পোস্টটি যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে তাহলে আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *