কিভাবে পারিবারিক ঐক্য তৈরি করা যায় ( How to create family unity )

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কেউ কারোর খোঁজ খবর নেয়ার মতো পরিস্থিতি থাকেনা বা ইচ্ছা থাকে না । কিন্তু এই ব্যস্ত বিশ্বে আমাদের পারিবারিক কোটা অত্যন্ত জরুরি । যদিওবা এটা লক্ষ্য করা যায় না । বরং বর্তমান প্রজন্মের পরিবারের এক সদস্য অনেক সদস্যের প্রতি লড়াইয়ের প্রবণতা লক্ষ করা যায় । এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের পারিবারিক ঐক্য কমে যাওয়া । পারিবারিক ঐক্য কমে যাওয়ার ফলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা দিন দিন কমে যাচ্ছে । দিন দিন বড় পরিবার থেকে ছোট পরিবার এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে । এর অন্যতম কারণ হলো পারিবারিক ঐক্য না থাকা । পারিবারিক বন্ধন এমনই এক বন্ধন যে বন্ধনে আবদ্ধ থাকলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত । আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত পারিবারিক ঐক্য যেন নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা । বড় হবে সেদিকে খেয়াল রাখব যেন আমরা পারিবারিক ঐক্যটা আরো সুদৃঢ় করতে পারি । আমাদের আজকের এই ব্লগ থেকে আমরা জানাতে চেষ্টা করব যে কিভাবে পারিবারিক ঐক্য সুদৃঢ় করা যায় ।

 

পারিবারিক ঐক্য তৈরি করার উপায়

 

✅ পরস্পর যোগাযোগ ব্যবস্থা – পারিবারিক ঐক্য নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হলো পারিবারিক যোগাযোগব্যবস্থা বিনষ্ট হওয়া । অর্থাৎ পরিবারের এক সদস্য থেকে আরেক সদস্যের মধ্যে যোগাযোগের অন্তরায় । আজকাল পরিবারের সদস্য গুলো এতটাই স্বার্থপর হয়ে গেছেন যে নিজ পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেবেন সেগুলো তারা করতে চান না । আর এর ফলে তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় তা পারিবারিক নষ্ট করে ফেলছে । পরিবারের প্রতিটি সদস্য এটা মনে রাখতে হবে যে কোনভাবেই যেন পারস্পরিক যোগাযোগ বন্ধ না হয়ে যায় । এটা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটি সদস্য যেন প্রত্যেকের সন্নিকটে থাকে । এখানে সন্নিকটে থাকার অর্থ আমরা এটাই বুঝিয়েছে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন সচল থাকে । পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে এটা বুঝাতে হবে যে আপনারা একে অন্যের কথা শোনার জন্য কতটা আগ্রহী । হতে পারে আপনি দূরে থাকছেন কিন্তু তাতে কী বর্তমান মোবাইলের যুগ । আরে যদি কারো সাথে যোগাযোগ রক্ষা করাটা খুব কঠিন কিছু নয় । যখনি সময় পেয়ে গেলেন ঠিক তখনই পরিবারের কোনো সদস্য কে ফোন দিয়ে অন্যান্য সকল সদস্যদের খোঁজ নিন । আপনি ভাবছেন আপনার সময় নেই ফোন করার মতো । কিন্তু এরকমটা কখনোই করবেন না দুই মিনিট কথা বলার জন্য সময় থাকবে না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় । রাতের সাথে খাবার টেবিলে বসে কথা বলতে পারেন এতেও যোগাযোগ রক্ষা হয় ।

✅ মনোযোগ দিয়ে শুনুন – আপনি ঠিক যেমনটি চান যে আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুক , ঠিক তেমনি পরিবারের বাকি সদস্যরা হচ্ছে আপনিও তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন । আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা পরিবারের সদস্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে চান না । যখন কোন পরিবারের সদস্যরা কথা বলেন তখন তারা পাত্তাই দেন না । যা পারিবারিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করে । ভেবে দেখুন তো আপনি যদি কাউকে কোন কথা না বলেন সে যদি না শোনে তাহলে আপনার কেমন লাগবে । আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আপনার প্রচন্ড রকম রাগ হবে অভিমান হবে কষ্ট হবে । তাই নিজের কথা ভেবে হল পরিবারের কোন ব্যক্তি যখন আপনাকে কিছু বলবে তা মনোযোগ দিয়ে শোনো । এমনকি পরিবারের ছোট সদস্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করবেন । আপনার পরিবারের কোনো সদস্য যখন আপনার সাথে কথা বলবে তখন কথার মাঝে কথা না বলে তাদের প্রত্যেকটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন । পরবর্তীতে আপনার কোন কথা থাকলে তা বলুন । বরং তারা যখন কথা বলবে সে কথাগুলোতে আগ্রহ দেখান । যেমন ধরুন প্রসঙ্গক্রমে আপনি বলতে পারেন তারপর কি হয়েছিল , ওই বিষয়টি তোমার কেমন লেগেছিল , এটা সম্পর্কে তোমার পরিকল্পনা কি ইত্যাদি । এমনকি তারা কথা বলার সময় হ্যাঁ আমি শুনছি এরকম মনোযোগ দেখাতে পারেন ।

✅ প্রশংসা করুন – কারো প্রশংসা করা এটা বড় একটি গুন । এগুন সকলের থাকেনা । কিংবা সকলেই প্রশংসা করতে পারে না বা জানে না । আর পরিবারের সদস্যদের প্রশংসা করা এ বিষয়টি তো আমাদের মধ্যে একেবারেই নেই । পরিবারের সদস্যদের ছোটখাটো বিষয়ে প্রশংসা করুন । ধরুন আপনার মা কিছু রান্না করেছেন তাকে বলুন রান্নাটা অনেক মজার ছিল । আপনার বাবা আপনাকে একটা শার্ট উপহার দিয়েছেন । তাকে বলুন আপনার শার্টটা অনেক পছন্দ হয়েছে । শার্টটা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ । শার্ট পেয়ে আপনি অনেক খুশি । পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিশেষ গুণ গুলোর কথা বলে তাদের প্রশংসা করতে পারেন । এতে পরিবারের সদস্য গুলো অনেক খুশি হবে । আর পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে ।

 সহমত পোষণ করুন – পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদের অন্যতম একটি কারন হল মতের অমিল । মতের মিল না থাকার কারণে পরিবারে অশান্তি দেখা দেয় । তাই যথাসম্ভব পরিবারের প্রত্যেকটি বিষয়ে সহমত পোষন করার চেষ্টা করুন । হতে পারে আপনার পরিবার যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে সে যদি আপনার পছন্দ নাও হতে পারে । কিন্তু তাই বলে হুট করে সেখান থেকে উঠে চলে আসবেন এটা ঠিক নয় । বরং আপনি বুঝিয়ে বলুন আপনার এটা ভালো লাগে না এই কারণে । তাহলে তারা না বুঝলেও রাগ করবেন না । যখন আপনি তাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করবেন তখনই বিবাদের সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি । পরিবার সাধারণত যে বিষয়গুলো নিয়ে ডিসিশন নিয়ে থাকে সেগুলো পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ভালোর জন্য হয় তাকে । পারিবারিক ডিসিশন গুলোতে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি নমনীয় এবং স্মরণীয় রাখার চেষ্টা করে । অযথাই কোনো তর্ক বিতর্কে জড়াবেন না তর্ক এড়িয়ে চলুন । গঠনমূলক সমালোচনা কিংবা মতামত প্রদানের চেষ্টা করুন ।

✅ ক্ষমা করুন – ক্ষমা করা মহৎ একটি গুণ । আর এই গুণটি যদি আপনি নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন তাহলে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারব আপনার কখনোই কারো সাথে কোন ঝগড়া বা বিবাদ লাগবেনা । সাধারণ ক্ষমা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন । এটা মাথায় রাখবেন যে পরিবারের সদস্য গুলো কিন্তু আপনার পর কেউ নন একদিন তারাই আপনার আপন ছিল । অযথাই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে রাগ করে থাকবেন না যে কেউ একজন ক্ষমা করলে দেখবেন কারো কোন আপত্তি থাকবেনা । বরং সম্পর্ক আরো মজবুত হবে । শুধু ক্ষমা করলেই হবে না নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চান । আমরা অনেকেই আছি নিজের ভুল কখনো ক্ষমা করি না । কিন্তু আমার যদি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাই তাহলে অপর অপর ব্যক্তির মনে খানিকটা সহানুভূতি জায়গা তৈরি হবে । আর সেখান থেকে আপনারা দুজনেই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবেন । আপনি যদি দেখেন পরিবারের দুই পক্ষ তৈরি হয়েছে তাহলে দু’পক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যেনো তারা একে অপরকে ক্ষমা করে দেন । কেননা পরিবার যখন ভেঙ্গে যাবে তখন পরিবারের শক্তি বহুগুণে কমে যাবে । তাই পরিবারের শক্তি বৃদ্ধি করার লক্ষ্য হলোও পারিবারিক ঐক্য তৈরিতে সচেষ্ট থাকুন ।

✅ পারিবারিক রুটিন তৈরি করুন – পরিবারের সদস্য হিসেবে আপনার একটু দায়িত্ব হয়ে থাকে পারিবারিক রুটিন তৈরি করা । যে রুটিনে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পছন্দ-অপছন্দ, খাবারের সময়, ঘুমানোর সময়, ঘুরতে যাওয়ার সময়, পড়াশোনার সময় ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকবে । যেমন ধরুন দুপুরের খাবারের সময় হয়েছে আপনি সবাইকে কি সবাই আসুন একসঙ্গে আমরা খেতে বসব । আবার রাতের খাবারের সময় ও দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে ডাক দেন । মায়ের ঔষধ খাওয়ার সময় এর কথাটাও মনে করিয়ে দিতে ভুলবেন না । এতে আপনার মা অনেক খুশি হবেন । বাসার ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনার কথা বলবেন । অবশ্যই সেটা আন্তরিকতার সাথে । কখনোই বাসার ছোট সদস্যদের রাগ করে কিছু বলবেন না । এতে তারা মনে অনেক কষ্ট পায় ।

✅ দায়িত্ব নিন – পরিবারের সদস্য হিসেবে আপনার কিছু দায়িত্ব থাকে । সে দায়িত্ব গুলো কখনোই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন না । এতে করে পরিবারের অন্যান্য সদস্য গুলো আপনার প্রতি বিরক্ত হবে ফলে পারিবারিক ঐক্য বিনষ্ট হবে । আপনি নিজের ঘর নিজে গোছানোর চেষ্টা করুন । নিজের কাপড় নিজেই পরিষ্কার করুন । মাঝে মাঝে বাজারের দায়িত্ব নিন । আপনি চাইলে কখনো কখনো বাসার ছোটদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে পারে । পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের এটা কখনোই মনে করিয়ে দেয়া যাবে না যে আপনি বাসার কিছুই করছে না । বরং এটা বোঝানোর চেষ্টা করুন আপনার সাধ্যমত আপনি চেষ্টা করছেন পরিবারকে সহায়তা করার । আর আপনি যখন দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্য সহ আপনার সময়ও খানিকটা বেঁচে যাবে ‌। যার ফলে আপনারা সকলে মিলে সেই সময়টি কাজে লাগাতে পারেন । যেমন ধরুন গল্প করা টিভি দেখা বা ইনন্ডোর কোন গেম খেলা ।

✅ পরিবারকে প্রাধান্য দিন – পারিবারিক ঐক্য বজায় রাখার জন্য পরিবারকে প্রাধান্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি । আপার পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে সবকিছুর আগে পরিবারকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবারকে ভালবাসতে হবে । ছোটখাটো বিষয় গুলোতে করে পরিবারে সময় দিন । ধরুন আপনার বন্ধুর জন্মদিনে আপনাকে ইনভাইট করেছে । আবার সেই দিনে আপনার বাবার রুটিন চেকআপের দিন । আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার বাবার তো তেমন কিছুই হয় নি যাস্ট রুটিন চেকআপ । তাই আপনি বন্ধুর জন্মদিনে যেতে চান । আমি বলব জন্মদিনে চারটি কি খুব বেশি জরুরি ছিল । আপনি তো পারতেন আপনার বন্ধুকে বুঝিয়ে বলতে যে আপনার বাবার আজকে ডাক্তার দেখাতে হবে । আমার মনে হয় আপনার ভালো বন্ধু হয়ে থাকলে সে বিষয়টি ভালোভাবে নেবে এবং পরবর্তীতে সে বিষয় নিয়ে সে কোন রাগ বা ক্ষোভ পুষে রাখবেন না । এরকম ছোটখাটো বিষয়ে ত্যাগ করার মন মানসিকতা তৈরি করতে হবে । তবেই পারিবারিক বাক্য তৈরিতে একধাপ এগিয়ে যাবেন ।

✅ পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা করুন – আমাদের বাংলাদেশে পারিবারিক ঐতিহ্যের ব্যাপারটা বেশ জনপ্রিয় । প্রত্যেকটি পরিবারের কিছু নিজস্ব ঐতিহ্য আচার-আচরণ থাকে । যা পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের মেনে চলা উচিত । যেমন ধরুন বড়দেরকে সম্মান প্রদর্শন করা সালাম দেয়া, আবার রাতে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরা , নামাজ পড়া বা প্রার্থনা করা , ঠিকঠাক পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করা ইত্যাদি । আপনার মনে হতে পারে এমনকি এগুলো না করলে কি হয় । কাউকে সালাম দিলে নিশ্চয়ই আপনার কোন ক্ষতি হয়ে যাবে না । কিংবা রাতে বাসায় ফেরার ব্যাপারে আপনার পরিবারের সদস্যরা যদি রাগ করেন, তাহলে আপনার কাজগুলো তাড়াতাড়ি সেরে নিলেই তো হয় । পরিবারের প্রত্যেককে সদস্যদের প্রতি প্রত্যেকের আলাদা একটা প্রত্যাশার জায়গা আছে । কখনোই সে প্রত্যাশা জায়গাটি ভেঙ্গে ফেলবেন । কিংবা তাদের বিশ্বাস ভেঙ্গে দেবে না । এতে পারিবারিক কলহ প্রভাব পড়তে পারে ।

✅ সময় কাটান – আমরা আমাদের কাজকর্ম এতটাই বিজি হয়ে থাকে যে পরিবার নামে যে একটা কিছু রয়েছে সেটা আমরা ভুলে যাই । পরিবারের সদস্য হিসেবে আরো নানা পরিবারের সদস্যদের সাথে যথেষ্ট পরিমাণ সময় কাটানো উচিত । আপনি যদি সারাদিন সময় না পান সে ক্ষেত্রে রাত হল পরিবারের সদস্যদের সাথে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন । খাবার টেবিলে বসে অন্য সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করুন । প্রতি সপ্তাহে কিংবা মাসে সকলে মিলে কোথাও ঘুরতে যান , সিনেমা দেখুন । পরিবারের সাথে সময় কাটালে আপনার নিজেরও ভালো লাগবে বাকি সদস্যরাও খুশি হবেন । আপনার পরিবারে আপনি যত বেশি সময় দিবেন আপনার পরিবারে ততটাই ঐক্য হবে ।

3 thoughts on “কিভাবে পারিবারিক ঐক্য তৈরি করা যায় ( How to create family unity )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *